দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানকে হেলিকপ্টার থেকে নির্ভুলভাবে পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ৯০টি উন্নত উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সরবরাহে সম্মত হয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর ব্যাপক ব্যবহৃত এসব অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সূচিতে ৯০টি এপিইউ-এল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রপ্তানির একটি আদেশের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ক্রেতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘কে-১০’ নামে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইরানকে বোঝাতে এ সংকেত ব্যবহার করে।
তবে নথিপত্রে এসব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ইরানে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি। নথিগুলো ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে সরবরাহ করেছে ইউক্রেনের বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ডালাস অ্যানালিটিকস।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র
এপিইউ-এল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রাশিয়ার হালকা বহুমুখী পরিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র এলএমইউআর বা ইজদেলিয়ে ৩০৫ বহন করার জন্য তৈরি। নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্র চলন্ত লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করতে পারে।
২০২২ সালে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রটি। উড্ডয়নের সময় একজন পরিচালনাকারী এর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের দিক পরিবর্তন করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বিশ্বব্যাপী সামরিক সরঞ্জাম নির্দেশিকা অনুযায়ী, এপিইউ-এল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রাশিয়ার এমআই-২৮ আক্রমণকারী হেলিকপ্টারের জন্য তৈরি। প্রতিটি ব্যবস্থায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়।
ইরান ইতোমধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে এমআই-২৮ হেলিকপ্টার সংগ্রহ করেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানি কর্মকর্তারা এসব হেলিকপ্টার সরবরাহের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানান। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনলাইনে প্রকাশিত ছবিতে তেহরানের একটি বিমানঘাঁটিতে এমআই-২৮ হেলিকপ্টার দেখা যায় বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
অতিপ্রতিস্বনক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও সহায়তা রাশিয়ার
ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সরবরাহের তথ্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ইরানের অতিপ্রতিস্বনক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে রাশিয়ার গোপন সহায়তার বিষয়ে আগেই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
গত সেপ্টেম্বরে সংবাদমাধ্যমটির এক অনুসন্ধানে বলা হয়, ‘সি৪৩০এল’ সাংকেতিক নামের একটি কর্মসূচির আওতায় ইরানকে অতিপ্রতিস্বনক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা করেছে রাশিয়া। ফাঁস হওয়া রুশ চিঠিপত্র, ভ্রমণ নথি ও সামরিক পেটেন্ট পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া যায়। কর্মসূচিটি ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং এ বছরের ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের সময়ও চলেছে।
এই প্রকল্পে এমন একটি র্যামজেট চালনা ব্যবস্থা তৈরির কাজ হয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের গতির কয়েক গুণ গতিতে চলতে সহায়তা করতে পারে। এতে মার্কিন ও মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমে যেতে পারে।
ইরান ওই চালনা ব্যবস্থা তৈরি ও উড্ডয়ন পরীক্ষা করেছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো অতিপ্রতিস্বনক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কার্যকর সামরিক ব্যবহারে যুক্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পায়নি ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেছেন। পরে তারা ইরানের উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ুপ্রবেশ ব্যবস্থা ও ইঞ্জিনের নকশা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
যুদ্ধের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরদার
ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সরবরাহ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তার ঘটনা মস্কো ও তেহরানের সামরিক সহযোগিতার ভিন্ন দুটি দিক তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তর।
এর আগে ইরানকে ভেরবা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহে রাশিয়ার সম্মতির খবরও জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা একমুখী নয়। ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য ইরান আগে রাশিয়াকে শাহেদ আক্রমণকারী ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং রাশিয়ায় এসব ড্রোনের উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সময় মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে সহায়তায় রাশিয়া ‘খুব সামান্য, যদি আদৌ কিছু করে থাকে’।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক নিকোল গ্রাজেভস্কি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, রাশিয়ার নিজস্ব যুদ্ধকালীন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইরানকে সরবরাহ অব্যাহত রাখার আগ্রহ এবং পশ্চিমা আপত্তির প্রতি আগের তুলনায় কম উদ্বেগের বিষয়টি এ চুক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাশিয়ার সহায়তার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, চলমান সংঘাতে রাশিয়ার ভূমিকা অতিরঞ্জিত করে দেখা উচিত নয়।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক হান্না নোটে বলেন, ইরানকে সহায়তার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করছে মস্কো।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে এখনো কিছু সীমারেখা রয়েছে।’
তার মতে, ইরানকে রাশিয়ার দেওয়া সহায়তা সামরিক কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তবে তা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো নয়।
/অ